চরিত্রায়ণঃ ক্যালিগুলা কিংবা আমি, আমি কিংবা ক্যালিগুলা

বাবার কাছ থেকে শুনেছি আমার জন্মেরও অনেক আগে একবার এক যাত্রা দল এল আমাদের গ্রামে। চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রাম। মাঠে তাঁবু গেঁড়ে চলবে প্রদর্শনী। যাত্রার অধিকারী এসে দ্বারস্থ হলেন আমার দাদুর, গ্রামের মান্যগণ্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তি হিসেবে উনিই যেন বসেন টিকেট ঘরে। রাজি হলেন। শুনে অবশ্য আমি নিজেই অবাক হয়েছিলাম! আমার দাদু!? এই রাশভারী মানুষটা রাজি হলেন! যাই হোক বসলেন। যাত্রা প্রদর্শনীও হলো। কিন্তু সমস্যাটা হলো পরে। রব উঠলো সফেদ দাঁড়ির পাঞ্জাবি টুপি পড়া সর্বজন মান্য শিক্ষিত স্কুলমাস্টার যাত্রাপালার টিকেটঘরে বসলেন! 

শুনে আমার দাদু নাকি সব কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন “ আরে ওরা কি করে বুঝবে নাটকে এক চরিত্র থেকে আরেক চরিত্রে যাওয়ার কি মেধা। সৃষ্টিশীল মেধাবী না হলে কি এক শরীরে এত চরিত্র ধারণ সম্ভব? চরিত্রায়ন হচ্ছে মেধাবীদের কাজ আর আমি মেধার পক্ষে।“ ঘটনাটা শোনার পর দীর্ঘদিনের একটা প্রশ্নের উত্তর মিলে গিয়েছিলো চট করে। আমার পরিবারের সবাই সাংস্কৃতিক বিভিন্ন পরিমন্ডলে যুক্ত হলেও থিয়েটার এর সাথে দর্শক হিসেবে ছাড়া যুক্ত নয় সেখানে আমি মঞ্চে চরিত্রায়নে এত শিহরণ বোধ করি কেন? নানা চড়াই উৎরাইতেও কেন ভাবতে পারিনা আজ সন্ধ্যার মহড়াটা বাদ দেয়ার কথা। বুঝলাম বীজটা রোপিত হয়ে গেছে আমার জন্মের অনেক আগেই। 

সে যাই হোক, আজ আমার সামনে দাঁড়িয়ে ‘ক্যালিগুলা’। তার আগে পেছনটা একটু বলে নেয়া যেতে পারে। 

ক্যালিগুলা ফেইম নাট্যকলা বিভাগের ২২ তম প্রযোজনা। আমি ফেইম এর ৪র্থ ব্যাচ এর একজন শিক্ষানবীশ নাট্যকর্মী। ২০০১ সালে ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার শিক্ষা পদ্ধতিতে অনুপ্রাণিত ফেইম নাট্যকলা বিভাগের “এক্টরস স্টুডিও” তে ছয় মাস মেয়াদী “থিয়েটার এপ্রেসিয়েশন কোর্স” সম্পন্ন  করে কাজ করছি ফেইম এর সাথে। ২০০১ সাল থেকেই প্রায় প্রতিবছর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ চট্টগ্রাম এর আয়োজনে ফেইম ফরাসী নাট্যকারদের একটি করে নাটক মঞ্চায়ন করে আসছে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ চট্টগ্রাম এর নিজস্ব মিলনায়তনে। পরবর্তীতে ফেইম নাট্যকলা বিভাগ তা নিয়মিত মঞ্চায়ন করে বাইরের মঞ্চে। এক এক বছর এক একজন ফরাসী নাট্যকারের নাটক। ২০১৫ সালে নির্বাচিত হলো নাট্যকার আলব্যের কামু। নির্ধারিত হলো নাটক ‘ল্য জুস্ত’ এর অনুবাদ ‘ন্যায়পরায়ন’। মহড়ায় নিয়মিত রিডিং হতে লাগলো। বেশ কয়েকদিন হয়েও গেলো। একদিন নির্দেশক, আমাদের শিক্ষক অসীম দাশ (এন এস ডি স্নাতক) বললেন “নতুন একটা নাটকের অনুবাদ পড়ছি, সব্যসাচী দেব এর, আলব্যের কামুরই লেখা-ক্যালিগুলা। দারুণ স্ক্রিপ্ট। ক্যানভাসটা অনেক বড়। একবার পড়ে দেখা যেতে পারে।'' নাটক মঞ্চায়ন ও নির্মাণ পূর্ববর্তী পড়াশোনায় বারবার আলব্যের কামুর অন্যান্য নাটকের সাথে এই নাটকের প্রেক্ষাপটটাও উঠে আসছিলো আমার ও সহ নাট্যকর্মীদের প্রস্তুতি পড়াশোনায়। সিদ্ধান্ত হলো পরবর্তী মহড়াতেই ক্যালিগুলা রিডিং হোক। ল্য জুস্ত এর প্রস্তুতি সহায়ক হিসেবে। পরদিনের মহড়ায় পড়া হলো। সত্যিটা হলো প্রথম রিডিং এ অবয়বটা ছাড়া নির্যাসটা অনেকটা পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। প্রেক্ষাপটটা চেনা বলে অবয়বটা তাও কিছুটা ধরা গেলো। অসীম দা জিজ্ঞেস করলো “কেমন লাগলো?” তারপর স্ববভাবত আলোচনা। বুঝলাম বেশীরভাগ সহঅভিনেতাদের আমার মতই অবস্থা! দাদা মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বললেন “ঠিক আছে কাল আরেকবার রিডিং হোক।'' এই মুচকি হাসিটা আমার চেনা...নিশ্চই নতুন কিছু খেলছে মাথায়।পরদিন আরেকবার রিডিং হলো এর মধ্যে সবাই একে নিয়ে কিছুটা পড়াশোনাও করে এসেছে। নাটক পড়া এগুচ্ছে আর পরদে পরদে এক অত্যাচারী নিষ্ঠুর রোমান সম্রাট এর ভেতর দিয়ে উন্মোচিত হতে লাগলো কালে কালে অন্যভাবে ভাবতে শেখা স্রোতের বিপরীতে চিন্তা করতে শেখা কোণঠাসা কিছু মানুষের হৃদয়ের গহীনের হাহাকার। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির জটিল যত হিসেব। আজ অন্যান্য সহনাট্যকর্মীদের মধ্যেও বুঝতে পারছিলাম সেই কম্পন। পড়া শেষ হলো আর সবার সেকি ডিটেইল এনালাইসিস। অসীম দা শুনছিলেন আর একেবারে শেষে বললেন “এ বছর বরং এটাই করি, ল্য জুস্তটা বরং তোলা থাক পরবর্তী কোনো বছরের জন্য।'' শুনে সবাই একটু ইতস্তত করতে লাগলো। একেতো মঞ্চায়নের সময় কাছাকাছি। ল্য জুস্ত নিয়ে এদ্দিনের পড়াশোনা। তার ওপর যে স্ক্রিপ্ট - তিন ঘন্টার কমতো নয়। অনেকটুকু এডিট করতে হবে। যদিও ফেইম নাট্যকলা বিভাগ সফোক্লেস এর গ্রীক ট্রিলোজির তিনটি ভাগ (ইডিপাস, ইডিপাস এট কলোনাস, আন্তিগোনে) একত্রে মঞ্চায়ন করে টানা সাড়ে চার ঘন্টা। তবে দাদা যখন বলছে তখন নিশ্চই কোনো পরিকল্পনা ওনার মাথায় নিশ্চিতভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে কারণ তাঁর সাথে আমার এই পথচলার অভিজ্ঞতায় জানি এসব ক্ষেত্রে ভীষণ সাহসী তিনি।

অতএব পরদিন থেকে নতুন যাত্রা। নতুন পড়াশোনা, নতুন চিন্তা। টানা কয়েকদিন রিডিং এর পর চরিত্র নির্বাচন। আমার জন্য? ক্যালিগুলা!! তবে পাওয়ার আত্মবিশ্বাসটা নেহায়েৎ ছিলোনা তা নয়। এতদিন পড়াশোনা হয়েছে কামু, কামুর নাটক, তাঁর ভাবনা, সমকালীন রাজনীতি, সমাজের অবস্থা, তাঁর লেখার সাথে সমকালীন প্রেক্ষাপটের যোগসূত্র নিয়ে। চরিত্র নির্বাচনের পর বরাবরের মতো শুরু হলো নিজের চরিত্র নিয়ে ভাবনা, পড়াশোনা আর নানান দিক থেকে বিশ্লেষণ। শুরুতেই দ্বারস্থ হলাম গুগলের। ইতিহাসের সত্যিকারের এক ক্ষ্যাপাটে চরিত্র রোমান সম্রাট ক্যালিগুলাকে নিয়ে হাতে আসতে লাগলো নানা লেখা, নানা ছবি, নানা চলচ্চিত্র। কিছু কিছু রীতিমত লোমহর্ষক, ক্ষেত্র বিশেষে গা গুলিয়ে ওঠার মত। এখন প্রশ্নটা হচ্ছে কামু তাঁর নাটকে কোন ক্যালিগুলাকে দেখাতে চেয়েছেন? তার সাথে আজকের সময়ের যোগসূত্রটা কোথায়? কেন ক্যালিগুলার মত ঐতিহাসিক চরিত্রকে অবলম্বন করলেন তিনি? বুঝতে পারছিলাম রাঙতায় মোড়ানো প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব সহজ হবেনা। হাতে আসতে লাগলো বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের ছোট ছোট লেখা, আর্টিকেল। Existentialist কামুর ভাবনা, দর্শন ভেতরটায় নাড়া দিতে লাগলো অবিরত। পড়ি আর মনে হতে থাকে ‘আরে এতো আমারই কথা! আমার চারপাশটার ছবি।' সব্যসাচী দেব এর অনুবাদে সংলাপ গুলো বেশ ঝরঝরে- পড়ি আর বুঝতে শুরু করি সংলাপে যা বলা হচ্ছে পেছনে রয়েছে তার চেয়ে বেশী কিছু, বিস্তৃত অর্থ। চরিত্রায়ণে যুক্ত হতে থাকলো ভিন্ন ভিন্ন প্রলেপ। চরিত্রায়ণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে আমি যা করি তা হলো- প্রথম যে ভাবনাটা আমার মাথায় আসে তা বাদ দিয়ে দিই কারণ আমার ধারণা আমার মাথায় যেটা প্রথমে আসলো অন্য আরও দশজনকে ভাবতে দিলে হয়তো একই ভাবনাই তাদের মাথায় আসতো। তাই শরণাপন্ন হই দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ভাবনার। প্রয়োজনে আরও পরের। আবার কখনো ঠিক ঘুরে আসি প্রথমের কাছেই- মনে হতে থাকে এটা একেবারে মৌলিক কিছু দাঁড়াতে পারে। তাতে কাজও হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।

ক্যালিগুলার চরিত্রায়ন করতে গিয়ে আমার বারবার মনে হচ্ছিলো ক্যালিগুলার ভেতরটা বোধহয় আমার ভীষণ চেনা। দু ঘণ্টার নাটকে এতবার চরিত্রের রূপ বদল- কখনো সদ্য প্রেমিকা হারানো হতবিহ্বল তরুণ সম্রাট, একটু পরই নৃশংস অবিবেচক রাজা, প্রেমিক ক্যালিগুলা, ক্ষ্যাপা পাগলাটে খুনি,  নিতান্ত কিশোর স্কিপিও’র কাছে নিজেকে অবলীলায় উন্মুক্ত করে দেয়া সহজ ক্যালিগুলা, রোমানদেবী ভেনাস এর বেশে, চেরিয়ার ষড়যন্ত্র জেনেও তাকে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করতে চাওয়া যুক্তিবাদী ক্যালিগুলা, ব্যালেরিনা, শেষে প্রেমকে চুড়ান্ত পরিণতি দেয় প্রেমিকা সিজোনিয়াকে নিজ হাতে হত্যা করে যা কেবল ক্যালিগুলার পক্ষেই হয়তো সম্ভব। এক শরীরে এত চরিত্রে কি নেই!! কিন্তু ভেতরে একটাই মন। নানা রঙ্গে হয়তো বদলাচ্ছে কিন্তু কেন্দ্রবিন্দুটা এক জায়গাতেই, এক যুক্তিতেই নিবদ্ধ।  প্রতিদিনের মহড়ায় সহকর্মীরাও দিতে থাকলো নানান তথ্য। ভাবনা নিয়েও মতামতের আদান প্রদান হতে থাকে। আবার কেউ হয়তো ব্যালে নাচের মুদ্রাটাও নিয়ে আসে ইউটিউব ঘেঁটে। নির্দেশক এর কস্টিউম ডিজাইন হয়ে যাওয়ার পর সহকর্মীরাই যোগাড় করলো নানা অনুষঙ্গ যেনো সবারই চাওয়া - চরিত্রে মনোনিবেশ করো। বেশ কিছু স্কেচ দাঁড় করালাম নিজের ছবির ওপর। কিন্তু এত এত স্বত্তা এক চরিত্রে একটু কঠিনই বটে। শুরু করলাম চরিত্র ধরে ধরে আঁকা। কখনো চোখ এর প্রাধান্য তো কখনো কপাল, ভ্রূ, মুখের পেশী।আর আয়নার সামনে দাঁডিয়ে সুজাত-ক্যালিগুলা মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছি অগনিত। কখনো আত্মিক যোগসূত্রটা তৈরী হয়েছে, কখনো না। প্রতিদিন মহড়ায় আবিষ্কার করতে লাগলাম সংলাপের নানা অলিগলি। কচিৎ পালটে যেতে লাগলো সংলাপের অর্থও। Monologue গুলোর এত অসাধারণ বুনন! বলছি কিন্তু কখনো কখনো ঠিক ভাবটাকে স্পর্শ করতে পারছিনা তো নির্দেশক বারবার জানিয়ে দিচ্ছেন আরও ভাবা প্রয়োজন। মধ্যরাতেও হয়তো কখনো জেগে উঠে হঠাৎ পেয়েছি সংলাপের নতুন কোনো মাত্রা, নতুন কোনো অর্থ কিংবা ছোট্ট নতুন কোনো কাজ যা হয়তো ক্যালিগুলাকেই দেবে নতুন ধরণ। নতুন এ পাওয়ার উত্তেজনায় হয়তো ঘুমও হয়নি আর। তবু পেলাম তো! এক্ষেত্রে বলে রাখা যেতে পারে নির্দেশক তাঁর সেট, প্রপস, মিউজিক ডিজাইন এ এমন কিছু অনুষঙ্গ যোগ করে দিচ্ছিলেন যাতে আমার ক্যালিগুলা চরিত্রায়নে পাচ্ছিল নতুন নতুন মাত্রা। সহকর্মীরাও নিজেদের এমন ভাবে তৈরি করছিলো পরষ্পরের সেঁতুটা দৃঢ় হচ্ছিলো আরও। যাতে অবলীলায় হাঁটা যায় পরম বিশ্বস্ততায়।

২৬ নভেম্বর, ২০১৫ হলো ক্যালিগুলার প্রথম মঞ্চায়ন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ চট্টগ্রাম মিলনায়তনে। মঞ্চায়ন শেষে প্রতিক্রিয়ায় মনে হলো সবার পরিশ্রমের সততা দর্শকদের কোথাও কম্পনটা দিয়ে গেছে যদিও নির্দেশক অসীম দা বরাবরই বাহবা নেয়া থেকে দূরেই থেকেছেন আমাদেরও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন “তোমরাই ভালো জানো আজ সন্ধ্যায় কি করতে চেয়েছিলে আর কতটুকু করতে পেরেছো? Because you are the best doctor of your own.” মনে হলো ক্যালিগুলার মতো বিস্তৃত ক্যানভাসটা সবার ভেতরে একটা তোলপাড় করে দিয়ে গেছে বেশ। কে জানে সবার ভেতরেই হয়তো একই কথাই অনুরণিত হয়...কেউ বুঝতে পারে...কেউ পারেনা। এরপর এক একটা মঞ্চায়ন যায় আর স্বাভাবিক ভাবেই পরিবর্তন আসতে থাকে কস্টিউম, সেট, ব্লকিং ডিজাইন এ। আরোও ডিটেইল এ, আরও গভীরতর ভাবনায়। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি ক্যালিগুলা আমার ভেতরে বাস করতে শুরু করেছে। চিন্তায়তো বটেই কে জানে মননেও হয়তো। বলতে দ্বিধা নেই পয়ঁত্রিশোর্ধ নাটকে পঞ্চাশোর্ধ চরিত্রে অভিনয়ে সব চরিত্রই নিজ সন্তানের মতো প্রিয় তবু “ক্যালিগুলা”টা যেনো বড় বাপ নেওটা আদুরে সন্তান হয়েছে আমার। সময়ে সময়ে এসে জুড়ে বসে। আজ ২০১৯ এ এসে মনে হয় কিছু পরিবর্তন বেশ জেঁকে বসেছে আষ্টেপৃষ্ঠে...জানিনা বয়সের সাথে তা আপনিই হয় কিনা নাকি ক্যালিগুলাই চাইছেনা আমাদের সম্পর্কের সূতোটা আলগা হোক।

শেষ করি ক্যালিগুলা দিয়ে পাওয়া অগণিত ভালোবাসার কিছু কিছু মনে লেগে থাকা কথা দিয়ে- ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকে দিল্লীর কামানী মিলনায়তনে বাংলা সংলাপ বুঝতে না পারা চেন্নাই এর এক তরুনী এসে বলেছিলো- “আমি কি তোমাকে ছুঁয়ে কিছু কথা বলতে পারি?” আমি হেসে সম্মতি দেয়ার পর আমার হাত ধরে ইংরেজীতে বললো- “আমাদের শো ছিলো আরো ৭ দিন আগে, দল চলে গেছে, আমি, বাবা আর মা থেকে গেছি নাটক দেখবো বলে প্রতিদিন নাটক দেখেছি কিন্তু কিছুতেই মনের তৃপ্তিটা পাচ্ছিলামনা, গত সপ্তাহ খানেকের অপ্রাপ্তিতে আজ মা শপিং এ যাবার কথা, বাবাও বলছিলো গোছগাছ করবে তার ওপর বাংলাদেশের নাটক, কিন্তু ক্যালিগুলা নামটা শুনে ভাবলাম যাই দেখে আসি। বাবা মা কেও জোর করে এনেছি ভয়ে ভয়ে কিন্তু তুমি জাননা আজ তোমরা আমাদের কি দিলে, কি অনুভূতি নিয়ে আমি কাল ফিরবো, তুমি আমাকে কতটা ইন্সপায়্যার করলে...” পেছনে মেয়েটির মা বাবাও মুচকি মুচকি হেসে বলে উঠলো- “মেনি থ্যাংস”। পাটনায় আমাদের দলের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ছেলেটি নাটক মঞ্চায়নের পর দিন ভোরে এসে হিন্দিতে বলে বসে- “কাল পর্যন্ত আমার অন্যান্য সহকর্মীরা বিভিন্ন দেশের দল নিয়ে বেশ গর্ব করছিলো আর আমি বাংলাদেশের দল নিয়ে বেশ একটু মিনমিনে অবস্থাতেই ছিলাম কিন্তু কাল রাত থেকে পুরো উলটো হয়ে গেলো সব, বেশ দারুণ অবস্থার মধ্যে আছি। মনে হচ্ছে কাল তোমাদের সঙ্গে বোধহয় আমিও মঞ্চে ছিলাম!!” আমার বহুদিন মনে থাকবে মঞ্চায়ন শেষে আমার মাথাটা দীর্ঘক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সেই আধবয়স্ক ভদ্রলোকটির কথা। মাথা তুলে যাঁর চোখে জল আমাকে হতবিহ্বল করেছে তাঁর অপথ্য স্নেহের স্পর্শে। কে জানে কি খেলে যাচ্ছিল তাঁর মনের গহীনে। এরকম আরও অনেক স্নেহের, ভালোবাসার গল্প আমায় এনে দিয়েছে ক্যালিগুলা। থিয়েটার এর এ বিস্তৃত আঙ্গিনায় অমোঘ নেশায় পথ হাঁটতে চাই আরও সুদীর্ঘ সময়। কে জানে কোনোদিন হয়তো আমার ভেতরে আর নতুন কেউ এসে হাত ধরে ক্যালিগুলাকে আমূল পাল্টে দেবে অন্য কোনো চরিত্রে। মনে আশা এমন বাপ নেওটা সন্তানরা কেবল বাড়তেই থাকুক আমৃত্যু... 

- মুবিদুর রহমান সুজাত | নাট্যকর্মী, ফেইম 

Did you like this? Share it!

0 comments on “চরিত্রায়ণঃ ক্যালিগুলা কিংবা আমি, আমি কিংবা ক্যালিগুলা

Leave Comment