অনিশ্চিত অস্তিত্বের এক অন্তহীন অপেক্ষা…এবং ফেইম প্রযোজনা ‘প্রতীক্ষা অন্তহীন…’

আমার নব্বই উর্দ্ধ দিদিমা প্রায় স্মৃতিহীন। কথা প্রায় বলতে পারেননা, যা বলেন তার অর্থ বোঝা যায় না। ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে ‘ডিমেনশিয়া’। যখন উনার কোন প্রয়োজন পরে নানান শব্দ বাক্য বলে যে কথাটা প্রায় স্পষ্ট বলতে পারেন তা হল -- ‘আঁরে এক্কেনা মুক্ত কর’, ‘আঁরে এক্কেনা মুক্ত কর।’ আমাকে মুক্ত কর, আমাকে মুক্ত কর। দিদিমার আপাত এই বেঁচে থাকা আসলে এক অর্থে বন্দিত্বই। নির্জীব, নিরর্থক কিন্তু টেনে চলা এক জীবন। যিনি অপেক্ষায় আছেন মুক্তির কিন্তু জানেন না কবে তার মুক্তি? কে দেবেন তাঁকে মুক্তি? প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত তাঁর এই অপেক্ষা অনিঃশ্বেষ; মেয়ে, নাতবউ’র শত চেষ্টায়ও।

আমরাও কি আমাদের যাপিত জীবনে এই রকম অপেক্ষায় নেই? আমরাও কি অপেক্ষায় নেই মুক্তির? প্রতীক্ষায় কি নেই ক্লান্ত বয়ে চলা জীবনে, অবিরাম ছুটে চলা জীবনে, মধ্যবিত্তিয় সুখের নেশায় বা সর্বগ্রাসী পুঁজির অলীক স্বপ্নকথা সাকসেস (Success) বা উন্নতির মায়াজাল থেকে মুক্তির?

জীবন আমাদের প্রতিনিয়ত যে ভাবহীন, অর্থহীন, যুক্তিহীন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায় তাকে সরাসরি মঞ্চে তুলে নিয়ে আনেন অ্যাবসার্ড নাট্যকার। বাস্তববাদী নাটকের বিপরীতে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে জার্মানীতে উদ্ভব ঘটে অভিব্যক্তিবাদী নাটকের। সমসাময়িক সময়ে বাস্তব বিরোধী আরো তিনটি নাট্যধারা হল পরাবাস্তববাদ, ভবিষ্যৎবাদ এবং নির্মাণবাদ। তারই ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য অন্য দুটি নাট্যধারা হল এপিক এবং অ্যাবসার্ড নাটক। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সর্বগ্রাসি আগ্রাসন, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি স্বপ্ন ভঙ্গ, ঐশ্বরিক স্বত্তার প্রতি পরম অনাস্থা এবং দু’ দুটি বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি, ধ্বংসলীলা, অনিশ্চিত অস্তিত্বের এক অন্তহীন নৈরাশ্য, অনুভুতি সম্পন্ন মানুষকে দাঁড় করিয়েছে অর্থহীন, অন্ধকার, অসম্ভব এক ভবিষ্যৎ এর মুখোমুখি যার মঞ্চরূপ অ্যাবসার্ড নাটক। আধুনিক দার্শনিক অর্থে অ্যাবসার্ড মানে নিরর্থক। উদ্দেশ্যহীন, উদ্ভট, আজগুবি। কথাগুলি বহুল প্রচলিত। চিরায়ত জীবন ধারাকে বিকৃত করে নির্মম হাস্যকরভাবে দেখবার চেষ্টা, যাতে বেঁচে থাকার উদ্ভট প্রহসনকে অর্থহীন কৌতুক মনে হবে।

জীবনের যুক্তিহীন অবিন্যাস্ততাকে সার্থকতার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে তুলে ধরা যায় না, তাই অ্যাবসার্ড নাট্যকার এই জীবনবোধকে প্রতিফলিত করার জন্য নির্মাণ করেন নতুন নাট্য আঙ্গিক। তারই সার্থক রূপ স্যামুয়েল বেকেট’র নাটক ‘ওয়েটিং ফর গডো’। কবীর চৌধুরী অনুদিত, অসীম দাশ নির্দেশিত এই নাটকটির সার্থক মঞ্চরূপায়ন ‘ফেইম স্কুল অব ডান্স, ড্রামা এন্ড মিউজিক’ এর ‘প্রতীক্ষা অন্তহীন…’।

শুন্য মঞ্চে দেখা যাবে বিরান পথ, পাতা ঝড়া ধূসর বিস্তৃর্ণ প্রান্তর আর শুকিয়ে যাওয়া বৃক্ষ। দুইজন ভবঘুরে, পরনে তাদের ছিন্ন পোশাক, মাথায় গোল টুপি। শীত ও ক্ষুদায় কাতর তারা গডো’র জন্য অপেক্ষারত। গডো ঠিক কে, কার জন্য তাদের অপেক্ষা, কোথায় তাদের দেখা হবে, কোন সময়ে এবং কি তাদের দেখা হওয়ার উদ্দ্যেশ্য তা সঠিক তারাও জানে কিনা সন্দিহান। এই দুই মানুষ ডিডি (ভ্লাদিমির) এবং গোগো (এস্ত্রাগঁ) উভয়ে উভয়ের পরিপূরক। গোগো আবেগপ্রবণ এবং কাব্যিক, অন্যদিকে বাস্তববাদী ও যুক্তিবান ডিডি। তারা পরষ্পর স্বাধীন, ভিন্ন এবং আগ্রহী বিচ্ছিন্ন জীবন যাপনে। কিন্তু তারা কেউই বিচ্ছিন্ন হতে পারেনা কিছুতেই। কারণ একে অন্যের উপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। বার কয়েক আত্মহত্যার চেষ্টা করেও বিফল হতে হয়েছে তাদের। নাটকের দুই অংকেই তাদের দেখা হয় পোজ্জো আর লাকির সাথে। পোজ্জো ধনী, চঞ্চল এবং নিষ্ঠুর ক্ষমতাবান। অন্যদিকে লাকি জীর্ণ, অবনত, অবদমিত, ক্রীতদাস পোজ্জোর। পোজ্জো তাকে লাঠি হাতে গলায় দড়ি বেঁধে পশুর মত টেনে নিয়ে চলে। হতে পারে লাকি হয়ত পরাজিত মানবতা বা মানবিক বোধ আর পোজ্জো শোষকের প্রতীক। নাটকের দ্বিতীয় ভাগে দেখা যায় পোজ্জো অন্ধ হয়ে গেছে আর লাকির গলার দড়িই তখন তার একমাত্র অবলম্বন, তা ধরেই তাকে পথ চলতে হয়। এই দুই চরিত্র নাটকের দুই ভাগেই চেষ্টা করে গোগো আর ডিডির সাথে ভাব বিনিময়ের, ব্যার্থ হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। গোগো আর ডিডি অপেক্ষার পর অপেক্ষায় থাকে গডোর আশায়। লক্ষনীয় হল প্রতি দৃশ্যের শেষে একটি বালক এসে জানিয়ে যায় গডো আজ আসবেননা কিন্তু আগামী দিন অবশ্যই আসবেন। সেই আগামী আর শেষ হয় না, শেষ হয় না তাদের অপেক্ষার। এই চার মানুষের মাঝে কথাবার্তাগুলো অসংলগ্ন, আপাত দৃষ্টিতে প্রায় নিরর্থক। নাটকে কোন সংঘাত নেই। কোন ঘটনা নেই। কিছুই ঘটছেনা - এটাই এই নাটকের প্রধান ঘটনা। লাকির অন্ধ ও বোবা হয়ে যাওয়া এই কিছুই না ঘটা নাটকের একমাত্র অঘটন।

ফেইম প্রযোজনায় ডিডি চরিত্রে মুবিদুর সুজাত আর গোগো চরিত্রে কমল বড়ুয়া একেবারে যথাযথ। মঞ্চ জুড়ে চরিত্র রূপদানকারী সুজাত আর কমলের অসংলগ্ন সংলাপ উচ্চারণ যেন আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে জীবনে আসলে কিছুই ঘটে না, মানবজীবন উদ্দ্যেশ্যহীন নিরর্থক কতগুলো অঘটনের সমষ্টিমাত্র। সুজাতের মঞ্চ পারঙ্গমতা প্রশ্নাতীত। ইতিপূর্বে নিজের সামর্থের জানান দিয়েছেন বেশ কয়েকটি প্রযোজনায়। পর পর কয়েক প্রযোজনায় তার অভিনয়ে একধরনের পুনারাবৃত্তি দেখা গেলেও তিনি নিজেকে প্রায় নতুন রূপে উপস্থাপন করেছিলেন ‘ক্যালিগুলা’য় মূল চরিত্রে। কিন্তু এই নাটকের ডিডি চরিত্রে সুজাত নিজেকে ভেঙ্গেছেন একেবারে গোড়া থেকে। প্রায় একঘেয়ে সংলাপ গুলো তিনি এমন নিপুণতায় ও চমৎকার অভিব্যাক্তির মাধ্যমে বলেছেন যে প্রতিটি কথায় মনে হয়েছে তার নিজের কথা একি সাথে দর্শকেরও। অন্যদিকে কমলের অভিনয়ের প্রতি আমার মুগ্ধতা বেশ কিছুদিন ধরেই। আপাত ছোটখাট এই মানুষটি চরিত্র রূপায়ন করেন অনায়াস দক্ষতায়। প্রতিটি চরিত্রের ভিতরে প্রবেশ করে তিনি বের করে আনেন সেই চরিত্রের রূপরস, যেমনটি তিনি করেছেন গোগো চরিত্রে। ক্ষত বিক্ষত পা নিয়ে ক্ষেপাটে, আত্মহত্যাপ্রবন এবং ক্লান্তিকর অপেক্ষারত গোগো আর কমল যেন মিলে মিশে একাকার। পোজ্জোর উন্মাদনা, ক্ষমতা কেন্দ্রিক দাম্ভিকতা আর পরবর্তিতে দৃষ্টিহীন হয়ে যাওয়ার ঘটনা দারুন সাবলীল রূপায়ন করেছেন দীপ্ত চক্রবর্তী। চেষ্টা করেছেন পোজ্জোর যথাযথ বিশ্বাসযোগ্য রূপায়ণ করতে। তরুন নাট্যাভিনেতা হিসেবে দীপ্ত মেধাবী এবং অনুসন্ধিৎসু। পোজ্জো চরিত্রে দীপ্ত সেই স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রায় সংলাপহীন একটি চরিত্র লাকি। মঞ্চে তার আসা যাওয়া একেবারেই তার নিজের ইচ্ছাধীন নয়, অন্যের দ্বারা পরিচালিত এক চরিত্র। ফরহাদ হোসেইন এই মূক চরিত্রে ভাষা দিতে পেরেছেন বাঙময় নিরবতায়। নিরবতাও যে একটি ভাষা আর মঞ্চে তার সার্থক প্রয়োগ করতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়। ফরহাদ তা করেছেন দারুন দক্ষতায়। বালক চরিত্রে পুজা বিশ্বাস বেশ সাবলিল। তবে তার আসা যাওয়া আর মঞ্চ উপস্থিতি নিয়ে নির্দেশক আরেকটু ভাবতে পারেন।

‘প্রতীক্ষা অন্তহীন..’ এর নির্দেশক অসীম দাশ, একি সাথে মঞ্চ, মিউজিক, কষ্টিউম ডিজাইনও তাঁর। নির্দেশক হিসেবে অসীম দাশের ক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণের চেয়ে বড় হল তাঁর অতীত কাজগুলোর সাথে বর্তমানের কাজ গুলোর ধারাবাহিকতা, গতিশীলতা, নিজেকে নিজে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এই কারণে অসীম দাশ নিয়ত নিরীক্ষারত এবং নিরীক্ষার সফল প্রয়োগ ঘটান মঞ্চে। এই নাটকেও তিনি সেই সাফল্য অব্যাহত রেখেছেন। প্রায় নিরাভরন মঞ্চে শুকনো পাতা ছড়িয়ে, একটি বৃক্ষ কান্ডকে উল্টো করে ঝুলিয়ে এবং নাটকের দ্বিতীয়ভাগে সবুজ পাতা উল্টো করে বেঁধে তিনি দর্শককে বাধ্য করেছেন নাটকের অসঙ্গলগ্নতায় মনোনিবেশ করতে। সাথে হলুদ আলোর প্রাধান্য দিয়ে জীবনের ধূসরতাকে মুর্ত করেছেন নিপুণ দক্ষতায়। মঞ্চের সামনে এবং পেছনে মোটা দড়ির গান্ডীব রেখায় অসীম দাশ আঁকতে চেয়েছেন জীবনের সীমারেখা, গন্ডিবদ্ধতা। পরন্ত বিকেল আর ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা একা ডিডি যেন ব্যক্তি মানুষের একাকিত্ব আর অসহায়ত্বের প্রতীক। নির্দেশক নাট্যকারের অসংলগ্ন সংলাপগুলো তার চরিত্রগুলো দ্বারা এমন ভাবে রূপ দিয়েছেন যেন কথা বলছে আমাদের সাথের কেউ যা আমাদের নিজের কথা এবং একি সাথে সবার। প্রতিটি চরিত্রের এমন সাবলিল উপস্থাপন নির্দেশকের বহুমাত্রিক চিন্তা আর দক্ষতার দৃষ্টান্ত।

নাটকের চরিত্র গুলোর উদ্দেশ্যহীন অসংলগ্ন সংলাপ যেন জানিয়ে দিচ্ছে জীবনে আসলে তেমন কিছুই ঘটেনা, মানবজীবন উদ্দ্যেশ্যহীন নিরর্থক কতকগুলো অঘটনের সমষ্টি। কিছু জিজ্ঞাসা, কিছু প্রশ্ন, কিছু অনিশ্চয়তা আর কিছু বৈচিত্রহীন একঘেঁয়ে আমাদের মানব জীবন। যেমনটা লেখার শুরুতে বলছিলাম দিদিমার কথায়। যিনি বসে আছেন মুক্তির অপেক্ষায়। আশার মরিচিকা, টেনে নিয়ে চলা সময় আর অনন্ত মুক্তির অপেক্ষায় কাটে মানবজীবন। যদি না হঠাৎ কোন বিপর্যয় লাকি ও পোজ্জোর মত উল্টে দিতে পারে দেখার চোখ, বোবা করে দিতে পারে ভাষা। আমরা অধিকাংশই একে অন্যকে পছন্দ করি না, হিংসা আর ঈর্ষায় একে অন্যের দিকে তাকাই কিন্তু সমাজ অস্বীকার করতে না পেরে একসাথে বাস করি ডিডি আর গোগোর মত, আর প্রতীক্ষায় থাকি গডোর। একি সাথে পোজ্জো ও লাকির মত প্রভুত্ব, দাসত্ব আর অন্ধ অনুগামী হয়ে থাকতে চাই যতই মুখে বলি আধুনিকতা আর বিজ্ঞানের চেতনার। আমরা প্রত্যেকেই আছি প্রতীক্ষায়, এক অন্তহীন প্রতীক্ষায়…

ফেইমকে এক বসন্ত শুভেচ্ছা এমন একটি প্রযোজনা মঞ্চে নিয়ে আসার জন্য। জয়তু ফেইম।

- অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য | নাট্যকর্মী


তথ্যসুত্রঃ
অ্যাবসার্ড ড্রামা- জীবনে ও মঞ্চে -- উর্ধ্বেন্দু দাশ
অ্যাবসার্ড নাটক -- দিলীপ কুমার মিত্র
অ্যাবসার্ড নাটকঃ স্যামুয়েল বেকেট ও ইউজিন ইয়োনেস্কো--জীবন বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিব্যাক্তিবাদী নাটক -- কবীর চৌধুরী

Did you like this? Share it!

0 comments on “অনিশ্চিত অস্তিত্বের এক অন্তহীন অপেক্ষা…এবং ফেইম প্রযোজনা ‘প্রতীক্ষা অন্তহীন…’

Leave Comment